এনআরসির আতঙ্ক সুজাপুরে

জুলফিকার আলি—- এই রাজ্যে কোনোভাবেই এনআরসি লাগু করতে দেওয়া হবে না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ঘোষণার পরেই নিশ্চিত হতে পারছেন না বাংলার বহু মানুষ। অসমে এক ধাক্কায় ১৯ লক্ষ মানুষ রাতারাতি বিদেশী তকমাপ্রাপ্ত হয়ে যাওয়ায় সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছেন মালদা জেলার কালিয়াচকের কয়েক লক্ষ মানুষ। এই দেশের পুরোনো নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র জোগাড়ে তাই তড়িঘড়ি নেমে পড়েছেন অনেকে। বহু মানুষ যেমন পুরাতন দলিলের খোঁজ করছেন, অনেকে আবার আধার কার্ডের সংশোধনেও ভিড় জমাচ্ছেন বিভিন্ন কেন্দ্রে। বুধবার এমনই দৃশ্য চোখে পড়ল স্টেট ব্যাংকের সুজাপুর শাখায়।
সম্প্রতি অসমে এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেই তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের নাম। অর্থাৎ ওই মানুষেরা আর ভারতীয় নাগরিক হিসাবে গণ্য হবেন না। যদিও সংশোধনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময় এবং নিয়ম বেধে দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও নিশ্চিত হতে পারছেন না বহু মানুষ। ইতিমধ্যে আতঙ্কে বেশ কিছু মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা অসমের এনআরসির ছায়া পড়েছে এই রাজ্যেও। বিজেপির পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে, এই রাজ্যেও কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসি চালু করবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য বিজেপির এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছে, বাংলায় এনআরসি চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এর মধ্যে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কালিয়াচকে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ নামে একটি সংগঠন প্রচার চালিয়েছে, খুব শীঘ্রই এই রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসি চালু করতে চলেছে। এরপরেই শুরু হয়েছে পুরাতন দলিল এবং আধার কার্ড সংশোধনের তৎপরতা। বুধবার সুজাপুর স্টেট ব্যাংকে গিয়ে দেখা গেল আধার কার্ড সংশোধনের জন্য প্রায় কয়েকশ মানুষ লম্বা লাইন দিয়ে অপেক্ষা করছেন। প্রত্যকেই এসেছেন আধার কার্ডে বয়স বা জন্মতারিখ ঠিক করার জন্য।
সুজাপুর থেকে আধার কার্ডের জন্ম তারিখ ঠিক করার জন্য হাজির হয়েছিলেন জুলফিকার আলি ব ভুট্টো। তাঁর বয়স ষাট বছর পার হয়েছে। তিনি বলেন, আমার আধার কার্ডে বয়স ভুল রয়েছে। শুনেছি, আধার কার্ডে বয়স ভুল থাকলে এনআরসিতে নাম বাতিল হয়ে যেতে পারে। এখনো যদিও প্রশাসনিকভাবে এমন কোনো কথা জানানো হয়নি। শুধু লোকের মুখেই এমন কথা শুনতে পাচ্ছি। তবে কোনোরকম ঝুঁকি নিতে রাজি হইনি । আধার কার্ডে বয়স ঠিক করার জন্য কয়েক ঘণ্টা ধরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আজ শুধু নাম লেখা হচ্ছে। প্রতিদিন ২০ জন করে ডাকা হবে। তারপরেই সমস্ত কিছু খতিয়ে দেখে সংশোধন করা হবে। সুজাপুরের বাসিন্দা আসাদুল্লা মণ্ডল বলেন, অসমে এনআরসি নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। কিছু মানুষ বলছেন, আমাদের রাজ্যেও নাকি এনআরসি চালু হতে পারে। কাগজপত্র ঠিক না থাকলে নাকি দেশ থেকে তাড়িয়েও দিতে পারে। তাই আগে থেকেই সমস্ত কাগজপত্র ঠিক করে রাখছি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে ফোন করা হয়েছিল জামাতে উলেমায়ে হিন্দের জেলা সভাপতি আবদুল হাই। তবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
সাধারণ মানুষকে অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন কালিয়াচক-১ ব্লক যুব তৃণমূল সভাপতি সারিউল শেখ। তিনি বলেন, আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কোনো অবস্থাতেই এনআরসি চালু করতে দেবেন না বলে জানিয়েছেন। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রশাসনের কাছে আবেদন করব, এই ধরনের মানুষদের চিহ্নিত করে প্রশাসন যাতে ব্যবস্থা নেই, সেই আবেদন জানাব।
সুজাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান আরিফ আলি বলেন, এনআরসি নিয়ে আমাদের এলাকায় একটা গুজব ছড়িয়েছে। অনেকেই এসে পুরাতন দস্তাবেজ ঘেঁটে জন্মের শংসাপত্র চাইছেন। অনেকে আবার পুরাতন ভাড়ার রসিদের খোঁজ করছেন। বেশিরভাগ মানুষই ১৯৭১ সালের আগের পরিচয়পত্র চাইছেন। পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে আমরা সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করছি। এছাড়াও সাধারণ মানুষ যাতে গুজবে কান না দেন, সেই আবেদনও জানাচ্ছি। গুজবে কান না দেওয়ার জন্য প্রশাসন থেকেও যাতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয়, সেই আবেদনও প্রশাসনের কাছে জানাব।