কালিয়াচকে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব পথের কাঁটা হয়ে উঠতে পারে বিধানসভায়

জুলফিকার আলি— কালিয়াচকের একাধিক পঞ্চায়েতে শাসকদলের গোষ্ঠীকোন্দল সুবিধা করে দিতে পারে বিরোধীদের। পঞ্চায়েতের সদস্যদের কাজকর্ম নিয়ে সাধারণ মানুষ শুধু তাঁদের উপরেই নয়, বীতশ্রদ্ধ দলের ওপরেও। এমনটা চলতে থাকলে আগামী বিধানসভা ভোটে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে বলে মনে করছেন দলের শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
মালদা জেলার কালিয়াচক-১ ব্লক বরাবরই কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত। গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রবল তৃণমূল হাওয়ার মধ্যেও সুজাপুর আসনটি নিজেদের দখলে রাখতে পেরেছিল কংগ্রেস। দলের প্রার্থী ইশা খান চৌধুরী এই আসনে জয়ী হয়ে দলের মুখ রেখেছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য এই বিধানসভার অন্তর্গত সমস্ত পঞ্চায়েতই তৃণমূল দখল করে। কংগ্রেসের হাতছাড়া হয় কালিয়াচক-১ পঞ্চায়েত সমিতি। এছাড়াও জেলা পরিষদের তিনটি আসনেও শাসকদলের প্রার্থীরা জয়ী হন। একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করতে সক্ষম হলেও এলাকার উন্নয়নে তৃণমূল পরিচালিত বোর্ডগুলি মানুষের আশা আকাঙ্খা পূরণে ব্যর্থ হয় বলে অনেকে অভিযোগ করেন। তবুও মানুষ তাঁদের ওপর আস্থা রেখেছিল। গত লোকসভা ভোটে সুজাপুর বিধানসভায় কংগ্রেস প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও ভোটের ব্যবধান অনেকটাই কমে যায়। এতেই উজ্জীবিত হয়ে এখন থেকেই সুজাপুর বিধানসভা দখলের ঘুঁটি আজাতে শুরু করেছে শাসকদল। দিদিকে বলো কর্মসূচিকে সামনে রেখে জনসংযোগের কাজে নেমে পড়েছে দলের যুব শাখা।এছাড়া এনআরসি ইস্যুকে সামনে রেখেও সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। কিন্তু এত সবের পরেও দলের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পঞ্চায়েত স্তরের সদস্যদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। উন্নয়নের কাজে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে কিছুদিন আগেই সুজাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন দলের অঞ্চল সভাপতি সোহরুল বিশ্বাস। এমনকি পঞ্চায়েত প্রধান এবং অঞ্চল সভাপতির ও তাঁর অনুগামীদের বিবাদ নেমে আসে রাস্তাতেও। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে কালিয়াচক থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের আলিনগর গ্রাম পঞ্চায়েতেও শাসকদলের গোষ্ঠীকোন্দল চরম আকার ধারণ করে।
তৃণমূলের এক গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যকে ভোজালি দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপানোর অভিযোগ উঠল দলেরই অন্য এক পঞ্চায়েত সদস্যের বিরুদ্ধে। বুধবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে মালদার কালিয়াচক থানার আলীনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাজার এলাকায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় জখম পঞ্চায়েতকে মালদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয় রাতে। ঘটনার জেরে জোর চাঞ্চল্য এলাকাজুড়ে। ঘটনার পর থেকে পলাতক অভিযুক্ত পঞ্চায়েত সদস্য। আহত ব্যক্তির নাম ফরিদুল ইসলাম ওরফে ফিটু। তিনি জোতপরম গ্রামের বাসিন্দা।তিনি আলীনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্য।পঞ্চায়েতের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ পদে রয়েছেন তিনি।অভিযুক্ত মাইদুর শেখ তিনিও একই পঞ্চায়েতের তৃণমূলের সদস্য। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রাত ৯ টা নাগাদ বাজার এলাকায় আলিনগর পঞ্চায়েত সদস্যদের মাঝে বিবাদ শুরু হয়।পঞ্চায়েতের কাজ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছিল। সেইসময় হাতাহাতি শুরু হয়। অভিযোগ, এরপরই পঞ্চায়েত সদস্য ফরিদুল ইসলাম ওরফে ফিটুকে এলোপাতাড়ি ভোজালি দিয়ে কোপ মারে ওপর পঞ্চায়েত সদস্য মাইদুর শেখ সহ তার দলবল।চিৎকারে গ্রামবাসীরা ছুটে আসতেই পালিয়ে যায় অভিযুক্ত পঞ্চায়েত সদস্য মাইদুর শেখ সহ তার অনুগামীরা। তড়িঘড়ি স্থানীয়রা আক্রান্ত তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্যকে সিলামপুর গ্রামীণ হাসপাতালে ভরতি করেন। আক্রান্ত পঞ্চায়েত সদস্যের গলায় ,মাথায় ,বুকে, পেটে সহ শরীরের একাধিক জায়গায় আঘাত গুরুতর থাকায় চিকিৎসকেরা স্থানান্তরিত করে দেন মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে।
পঞ্চায়েত সূত্রে জানাগেছে, ১৭ টি আসন বিশিষ্ট আলীনগর গ্রাম পঞ্চায়েত।গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল ১৪ টি , বিজেপি ২ টি ও কংগ্রেস ১ টি আসন পায়। তবে সকল সদস্যই তৃণমূলে চলে আসায় বিরোধীশুন্য পঞ্চায়েত গঠন করে তৃণমূল। দশজন সদস্যের সম্মতিতে প্রধান হন রুমি বিবি। তারপর থেকে দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েন পঞ্চায়েত সদস্যরা। দুই গোষ্ঠীতে পঞ্চায়েতে দ্বন্দ্ব চলছিলোই। তবে এদিন সেই লড়াই বহিঃপ্রকাশ হয়।পঞ্চায়েতের কাজ নিয়েই গন্ডগোল বলেই মনে করছে পঞ্চায়েত নেতৃত্ব।
স্থানীয় বাসিন্দা লিয়াকত আলী জানান,পঞ্চায়েতের কাজ নিয়ে ফিটু মেম্বারকে কুপিয়েছে মাইদুর। আমরা তড়িঘড়ি তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাই। গোটা শরীরে কোপানো হয়েছে ভোজলি দিয়ে। ঘটনা প্রসঙ্গে প্রধান রুমি বিবির স্বামী তথা অঞ্চল তৃণমূল নেতা এজাজুল হক জানান,পঞ্চায়েতের কাজ সমস্ত সদস্যের সম্মতিতে হয়।দলেরই সদস্যকে কেন কোপালো অপর এক সদস্য তা আমার জানা নেই।পঞ্চায়েতের কাজ নিয়ে গন্ডগোল হওয়ার কোনো কারণ নেই।সব সংসদেই কাজ হচ্ছে।আমি বিষয়টি দলের জেলা নেতৃত্বকে জানিয়েছি।
শুধু সুজাপুর বা আলিনগর নয়, শাসকদলের এই গোষ্ঠীকোন্দল প্রায় প্রতিটি পঞ্চায়েতেই অল্পবিস্তর রয়েছে।অনেক পঞ্চায়েতেই দলীয় সদস্যদের অন্ধকারে রেখে প্রধানরা নিজেদের মতো করে কাজকর্ম করছেন। এতেই ক্ষোভ বাড়ছে পঞ্চায়েত সদস্যদের মধ্যে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, মূলত পঞ্চায়েতে ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়েই দলীয় পঞ্চায়েত সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়াচ্ছেন। এতে একদিকে অনেক সদস্য যেমন প্রকাশ্যেই দলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন, তেমনই আবার অনেক সক্রিয় সদস্য নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন। এতে সাংগঠনিকভাবে দলের ক্ষতি হচ্ছে।
পঞ্চায়েতস্তরে শাসদলের এই গোষ্ঠীকোন্দল দলের জেলা ও ব্লক স্তরের নেতৃত্বের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালিয়াচক-১ ব্লক তৃণমূলের মনিটরিং কমিটির সদস্য সামিজুদ্দিন আহম্মেদ রাহুল বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালিয়াচকের মানুষের উন্নয়নের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে তাঁদের অভাব অভিযোগ শোনার জন্য তিনি দলের সমস্ত নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন। কিন্তু দলের নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্যদের একাংশ সেই কাজ না করে নিজেদের মধ্যেই বিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে দলের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হচ্ছে। দলীয় স্তরে বিষয়গুলি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আলিনগর ঘটনা প্রসঙ্গে স্থানীয় বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আলিনগরের ঘটনাটি দুঃখজনক। আলিনগরের মতো শান্তিপ্রিয় এলাকায় এমন ঘটনা কোনোভাবেই মানা যায় না। আগামীতে যাতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে তার জন্য দলীয় স্তরে আলোচনা করা হবে। পঞ্চায়েত পরিচালনা বা সাংগঠনিক কোনো সমস্যা থাকলে তা দলীয় স্তরে আলোচনা করেই মিটিয়ে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তা না করে যারা প্রকাশ্যে বিবাদে জড়াচ্ছেন, তাঁদের পাশে দল থাকবে না। প্রশাসন আইন মোতাবেক তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
হাজারো সমালোচনা সত্ত্বেও উন্নয়নের নিরিখে এখনো মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বাংলার কাণ্ডারি বলে মনে করেন। তাঁর ভাবমূর্তি দেখেই মানুষ এখনো তৃণমূল প্রার্থীদের ভোট দেন। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সুজাপুর, বৈষ্ণবনগর ও মোথাবাড়িতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শকেই ফের জয়ী করবেন। তবে যারা তাঁর আদর্শ না মেনে নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে দলের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করবেন, মানুষই তাঁদের প্রত্যাখ্যান করবে।