শিক্ষা ক্ষেত্রে জেলা তথা রাজ্যে নজর কাড়ছে কালিয়াচক

জুলফিকার আলি :-  ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই মালদা জেলার আর্থসামাজিক কাঠামোর মূল ভিত্তি ছিল কালিয়াচক। দেশের সীমান্তবর্তী এই ব্লক শুধু জেলা বা রাজ্য নয়, সারা দেশের কাছেই ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য পরিচিত একটি নাম ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে  অবস্থাটা অনেকটাই বদলেছে। কিছু অসাধু মানুষের অতিরিক্ত লোভ আর লালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে কালিয়াচকের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করেছে। সীমান্তে চোরাকারবার, এলাকা দখল, তোলাবাজির মতো বেআইনি কাজে অনেকে পড়িয়ে পড়েছে। সবথেকে আতঙ্কের বিষয়, এলাকার যুব সমাজকেও বিপথে চালিত করেছে এই অসাধু ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে অবশ্য সেই ছবির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। শুধু মাত্র বোমা, গুলির জন্য বিখ্যাত নয় কালিয়াচক।উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও কালিয়াচক যথেষ্ট নাম ডাক পেতে চলেছে ।কালিয়াচক এখন উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি করে চলেছে ।প্রতি বছর ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক  সহ একাধিক পেশাগত শিক্ষাতে যোগদান  করে চলেছে প্রচুর ছাত্র ছাত্রী।  ।

মালদা জেলার পিছিয়ে পড়া এলাকা হিসাবে কালিয়াচকের যথেষ্ট নামডাক রয়েছে ।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েরা যথেষ্ট সুযোগ না পাওয়ায় উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত থেকেছে ।বিগত দশক থেকে জনসাধারণের  মধ্যে বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।খেটে খাওয়া মানুষরাও নিজেদের ছেলে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা দিতে আপ্রান চেষ্টা করে চলেছে ।সংখ্যালঘু মানুষরা প্রচুর পরিশ্রমী।রেশম, লিচু, আম ও মাছ চাষ করে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন অনেকে। অনেকে  আবার ভিন রাজ্য শ্রমিকের কাজ করে জীবন ধারন করছে ।মহিলারা বিড়ি বাধার কাজ করে সংসারের কাজে হাত বাড়ান ।মালদা জেলার  অর্থনীতিতে কালিয়াচকের অবদান অপরিসীম ।কিন্তু নানা কারনে বঞ্চিত থেকেছে কালিয়াচক। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও লেখাপড়া না শিখলে প্রকৃত উন্নতি হয় না। এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন কালিয়াচকের মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই সন্তানদের পড়াশোনার দিকে নজর দিতে শুরু করেছেন অভিভাবকরা। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের পাশাপাশি লেখাপড়াতেও এই ব্লকের ছেলেমেয়েরা জেলা তথা রাজ্যে নজর কাড়ছে। প্রায় প্রতি বছরেই এই ব্লক থেকে বহু  কৃতী পড়ুয়া নানা ক্ষেত্রে কালিয়াচকের নাম উজ্জ্বল করে চলেছেন।

কালিয়াচক ১ ব্লকের উত্তর দারিয়াপুর গ্রামের খাদিজাতুল কুবরা এবছর মালদা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্ন হিসাবে যোগদান করেছেন ।খাদিজাতুল কুবরা খুবই গরিব পরিবারের কন্যাসন্তান ।বাবা ওসমান গনী মসজিদের ইমাম ও বেসরকারী মাদ্রাসার শিক্ষক। মা সফেদা বিবি বিড়ি বেধে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন ।তাঁর আর এক সন্তান হামাদ আলম জিডি থেকে ও আরেফা খাতুন রাহমাতে আলম থেকে ডাক্তারি পড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন ।কষ্টে সংসারের খরচ করে ছেলেমেয়েদের  উচ্চ শিক্ষার জন্য ওই পরিবার লড়াই করে চলেছেন ।অন্য দিকে উত্তর দারিয়াপুর গ্রামের আর এক গরিব পরিবারের সন্তান আমানুল ইসলাম এমবি বিএস নিয়ে পড়াশুনা করছে কোলকাতা পিজিতে ।সে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ।তাঁর বড় ভাই তউসিফ কামাল বিফার্ম নিয়ে পড়াশুনা করে সবে কাজে যোগদান করছেন ।বাবা রুহুল ইসলাম এর আগে রেশম চাষি ছিলেন ।বর্তমানে তিনি  অসুস্থ থাকায় কাজকর্ম করতে পারছেন না ।কিন্তু ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা করাতে গিয়ে সব কিছু তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন । ৫ সন্তানের বাবা রুহুল ইসলাম বলেন, তাঁর জীবনের একটাই উদ্দেশ্য ছেলে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা প্রদান করা ।তিনি আরও বলেন, তাঁর শারীরিক অবস্থা ভাল না থাকলেও নিয়মিত ছেলের সঙ্গে দেখা করতে কলকাতা যান ।তিনি আরও বলেন মুখ্যমন্ত্রীর প্রচেষ্টায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষার যথেষ্ট সুযোগ গ্রহন করতে পারছে । শুধু উত্তর দারিয়াপুর গ্রামে এ বছর ৪ জন ডাক্তারিতে সুযোগ পেয়েছেন ।অনেকে চেষ্টা করে চলেছে ।বড় নগর ডাঙার সাগুফতা ফাহিরা এবারে মেডিকেল জয়েন্ট পরীক্ষায় বসেছিল ।এবারে ৩৯৬ পেয়েছে ।সাগুফতা ফাহিরার আশা সামনে তিনি ডাক্তারিতে চান্স পাবেন ।সাগুফতার বাবা  সেনাউল হক রাজ্য সরকারের পঞ্চায়েত দপ্তরে সহায়ক পদে কাজ করছেন ।খুব কম টাকা বেতন পান ।তিন সন্তানের শিক্ষাতে সব টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে ।মা জলি খাতুন বলেন আমরা সব সুখ আহ্লাদ বাদ দিয়ে ছেলে মেয়েদের শিক্ষা জন্য চেষ্টা করছি ।

Top Books for Medical Entrance Exams

কালিয়াচকের তিনটি ব্লকে কম করে ৬০-৭০ জন ছাত্রছাত্রী এ বছর ডাক্তারি পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন। আলিপুরের  জিয়াউল হোসে্নের দুই সন্তান সেখ সাহিদ আক্তার ও সেখ নাইম আক্তার ।দুজনেই ডাক্তারিতে পড়ছে ।প্রথম সন্তান এনআরএস কলেজের প্রথম বর্ষে ও দ্বিতীয় সন্তান উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষে পড়াশুনা করছেন ।বাবা জিয়াউল হোসে্ন বিড়ির ঠিকাদার।তিনি বলেন অনেক দিন তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ।অনেক কিছু হারিয়ে এখন একটাই লক্ষ্য, ছেলেদের ভালোভাবে মানুষ করা । তিনি আরও বলেন, কালিয়াচকের তিনটি ব্লকে সংখ্যালঘু মুসলমানরা শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে গেছে ।আরও শিক্ষার প্রসার ও প্রচার হবে।সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন এগিয়ে এসেছে।সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কালিয়াচক এখন শিক্ষার হাবে পরিণত হয়েছে।প্রায় ৩০০ আবাসিক মিশন স্কুল।প্রায় ৩-৪ হাজার ছাত্রছাত্রী  বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা করছে ।আগামিতে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার প্রচুর হবে ।এতে কালিয়াচকের বদনাম ঘুচবে ।এ বছর কালিয়াচকের তিনটি ব্লকে কম করে ৬০-৭০ জন ছাত্রছাত্রী  ছাত্রি এ বছর ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছে.তবে সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বর্তমান রাজ্য সরকার  যথেষ্ট সহযোগিতা করে চলেছে ।সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন ভাতা দিয়ে উচ্চশিক্ষার রাস্তা খানিকটা হলেও খুলে দিয়েছে রাজ্য সরকার। সরকারি এই সদিচ্ছা এবং নিজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই শিক্ষার মানচিত্রে ক্রমশ উপরের দিকে উঠে আসছে কালিয়াচকের মতো এক সময়ের পিছিয়ে পড়া ব্লক।

Complete NEET Guide Physics, Chemistry & Biology, Latest Edition