বৈষ্ণব সমাগমে জমজমাট রামকেলী ধাম

মালদা, ১৭ জুন — প্রতি বছরের মতো এবারেও জ্যৈষ্ঠ মাসের সংক্রান্তি তিথীতে শুরু হয়ে গেল মালদার ঐতিহ্যবাহী রামকেলি উৎসব । কথিত আছে, সন্ন্যাস গ্রহণের পর মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব পদব্রজে তীর্থ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। মালদায় এসে তিনি তৎকালীন বাদশাহ হুসেন শাহের দুই পার্ষদ দাবির খাস এবং দাবির মল্লিককে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। তাঁদের নাম দিয়েছিলেন রূপ গোস্বামী এবং সনাতন গোস্বামী। মালদায় মহাপ্রভুর আগমন এবং রুপ সনাতনের সঙ্গে তাঁর মিলনকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় উৎসব। শুধু মালদা নয়, দেশ বিদেশের বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীরা হাজির হন এই উৎসবে। প্রথমে তিনদিনের উৎসব শুরু হলেও সরকারিভাবে সেই মেলা এক সপ্তাহের জন্য চালু করা হয়। যদিও বেসরকারিভাবে এক মাসের বেশি সময় ধরে এই উৎসব চলে। এবারে রবিবার বিকালে রামকেলিতে মদনমোহন জিউয়ের মন্দিরের সামনে চৈতন্যদেবের মূর্তিতে মালা দিয়ে ও মঞ্চে প্রদীপ জ্বালিয়ে মেলার শুভ উদ্বোধন হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলাপরিষদের সভাপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল, জেলাশাসক কৌশিক ভট্টাচার্য, জেলাপরিষদের মেন্টর কৃষ্ণেন্দুনারায়ন চৌধুরি, ইংরেজবাজারের বিধায়ক তথা পুরপ্রধান নীহাররঞ্জন ঘোষ। এরপর মঞ্চে শুরু হয় বাউল গান। ইংরেজবাজারের বিধায়ক ও পুরপ্রধান শ্রীনীহার রঞ্জন ঘোষ রামকেলির বাদুল্লাবাড়ীতে চৈতন্যদেব, রুপ সনাতনের মূর্তির উদ্বোধনও করেন।
মালদার ইতিহাস থেকে জানা যায়, এক সময় বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়। তৎকালীন গৌড়ের বাদশা ছিলেন হুসেন শাহ। তাঁর মন্ত্রীসভার দুই সদস্য ছিলেন রুপ সনাতন গোস্বামী। ১৫০৯ খ্রিস্টাব্দে রামকেলিতে মদনমোহন জিউয়ের মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন তারা। বৃন্দাবনের মত এখানেও আটটি পুকুর খনন করেন। এবং এই রামকেলিকে তারা বৃন্দাবনের আদলে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। যার ফলে রামকেলি গুপ্তবৃন্দাবন নামে পরিচিত হয়। কথিত আছে ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দের জৈষ্ঠ্য সংক্রান্তিতে চৈতন্যদেবের পদার্পণ ঘটেছিল এই রামকেলিতে। তাঁর কাছেই বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী। মদনমোহন জিউয়ের মন্দির সংলগ্ন কদম্ব ও তমাল গাছের ছায়ায় চৈতন্যদেবের সাথে দেখা হয়েছিল রুপ সনাতন গোস্বামীর। সেখানেই দুইজনকে নাম মন্ত্র দেন মহাপ্রভু। তারপর থেকে এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রখার জন্য রামকেলি উৎসব শুরু হয়।
শনিবার সকাল থেকে আসতে শুরু করেন বৈষ্ণব বৈষ্ণবী, সাধু সন্তরা ও সাধারন ভক্তরা। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, আসাম, বিহার ও ঝাড়খন্ড থেকে দলে দলে ভক্তরা এসে মন্দির চত্বর দখল করেন তারা।
রামকেলী ধাম বৈষ্ণবদের কাছে পবিত্র তীর্থ হিসাবে চিহ্নিত। তাই তাঁরা এখানে এসে শান্তি লাভের চেষ্টা করেন। কথিত আছে, একসময় এই রামকেলী ধামেই বৈষ্ণব বৈষ্ণবীরা আসতেন নিজেদের সাধন সঙ্গী বা সঙ্গিনী খুঁজতে। কন্ঠী বদলের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের জীবন সঙ্গিনী বাছাই করতেন। বর্তমানে অবশ্য কন্ঠী বদল বে আইনি ঘোষিত হয়েছে। তবুও গোপনে কেউ কেউ এখনো এই প্রথা অনুযায়ী সাধনসঙ্গী বা সাধনসঙ্গিনী বাছাই করে থাকেন। এছাড়াও রামকেলীতে মাতৃপিণ্ড দানের ব্যবস্থা রয়েছে যা সারা ভারতে আর কোথাও দেখা যায় না। মূলত হিন্দিভাষী মহিলারা নিজেদের প্রয়াতদের স্মরণে পিণ্ড দান করে থাকেন। এই পিণ্ড দানের অধিকারী শুধুমাত্র মহিলারা। পিন্ডদানের পর প্রয়াতদের আত্মার শান্তি কামনা করে তাঁরা স্থানীয় ফিরোজ মিনারে প্রদীপ প্রজ্বলন করে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *